রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। নিরস্ত্র রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষদের গুলি করে সেনারা হত্যা করছে বলে অ্যাক্টিভিস্টরা দাবি করেছেন। সেনারা রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
.মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার আরাকান রোহিঙ্গা সালভ্যাশন আর্মি (আরসা) পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালানোর পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মংডু, বুথিডাউং ও রাথেডাউং এলাকায় সেনাবাহিনীর এই অভিযান শুরু হয়েছে। এই তিন অঞ্চলে প্রায় ৮ লাখ মানুষের বাস। জারি করা হয়েছে সকাল-সন্ধ্যা কারফিউ।

.

সরকার ১০০ জন নিহতের কথা জানালেও মানবাধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ৮০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আল জাজিরার পক্ষ থেকে স্বতন্ত্রভাবে এই তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মংডুর বাসিন্দা আজিজ খান জানান, শুক্রবার সকালে সেনাবাহিনী গ্রামে প্রবেশ করে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। সরকারি বাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) আমাদের গ্রামেই অন্তত ১১ জনকে হত্যা করেছে। গ্রামে আসার পর তারা নড়াচড়া করছে এমন কিছু দেখলেই গুলি করতে থাকে।

.

 আজিজ খান বলেন, নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে। এক নবজাতকও রক্ষা পায়নি।

ইউরোপভিত্তিক রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্ট ও ব্লগার রো নায় স্যান লুইন জানান, শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া নতুন অভিযানে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। মসজিদ ও মাদ্রাসা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েক হাজার মুসলিম খাদ্য ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন।

লুইন বলেন,  সরকার ও সেনাবাহিনীর কারণে আমার চাচাও দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তাদেরকে সরকার কোনও সহযোগিতা করেনি। উল্টো সরকারি বাহিনীই তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে লুটপাঠ চালিয়েছে। খাবার, আশ্রয় ও নিরাপত্তা নেই। কখন মৃত্যু হবে তাও জানে না তারা।

বুথিডাউং শহর থেকে মুইন্ট লুইন নামের বাসিন্দা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, সববাড়িতেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ হোয়াটস্যাপে হত্যাযজ্ঞের ভিডিও আদানপ্রদান করছেন। নারী ও শিশুকে হত্যার ভিডিও আসছে। নিষ্পাপ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। আমরা কেমন আতঙ্কে আছি তা আপনারা কল্পনাই করতে পারবেন না।

লুইন আরও বলেন, কেউই তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে যায় না। কিন্তু হাসপাতাল, বাজার বা যে কোনও স্থানে যেতে মুসলিমরা এখন ভয় পাচ্ছে। বিপজ্জনক এক পরিস্থিতি।

গত বছর অক্টোবরে ৯ পুলিশ হত্যার পর রাখাইন রাজ্যে আং সান সুচির সরকার কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। ওই অভিযানের সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও জাতিগত নিধনের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।

ফর্টি রাইটস নাম মানবাধিকার সংগঠনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথিউ স্মিথ জানান, কর্তৃপক্ষ সব রোহিঙ্গাকেই যোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করছে। সরকার নিহতের যে সংখ্যা বলছে তা ধামাচাপা দেওয়ার শামিল হবে। অনেক মানুষ পালাচ্ছে এবং সরকার তাদের কোনও সহযোগিতা করছে না।

রাখাইন রাজ্যে প্রায় ১১ লাখ মুসলিম রোহিঙ্গার বসবাস। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্যের শিকার হন। কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করলেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে দাবি করে মিয়ানমার এবং তাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। সূত্র: আল জাজিরা।